Global Header Bottom
ওয়ারেন বাফেট এর কোম্পানি বার্কশায়ার হ্যাথওয়ে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দেয় না!

ওয়ারেন বাফেট এর কোম্পানি বার্কশায়ার হ্যাথওয়ে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দেয় না!

ওয়ারেন বাফেট এর কোম্পানি বার্কশায়ার হ্যাথওয়ে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দেয় না!

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ওয়ারেন বাফেট এবং তাঁর কোম্পানি বার্কশায়ার হ্যাথওয়ে একটি কিংবদন্তির নাম। বাফেট নিজে কোকা-কোলা বা অ্যাপলের মতো অন্যান্য কোম্পানি থেকে প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) নিতে ভালোবাসেন, কিন্তু নিজের কোম্পানি বার্কশায়ার হ্যাথওয়ের পক্ষ থেকে বিনিয়োগকারীদের কোনো ডিভিডেন্ড দেন না।

১৯৬৭ সালে মাত্র একবারের জন্য তারা প্রতি শেয়ারে ১০ সেন্ট ডিভিডেন্ড দিয়েছিল, যা বাফেটের মতে একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এই দীর্ঘ ইতিহাস এবং ডিভিডেন্ড না দেওয়ার পেছনে বাফেটের খুব সুনির্দিষ্ট এবং যুক্তিযুক্ত অর্থনৈতিক দর্শন রয়েছে।

মূলধন পুনর্বিনিয়োগ ও চক্রবৃদ্ধি মুনাফা

বাফেটের মূল দর্শন হলো, “আমি যদি কোম্পানির ১ ডলার নিজের কাছে রেখে সেটাকে ১ ডলারের চেয়ে বেশি মূল্যে রূপান্তর করতে পারি, তবে সেটা বিনিয়োগকারীদের ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো মানে হয় না”। বার্কশায়ার হ্যাথওয়ে তাদের উপার্জিত সমস্ত মুনাফা নিজেদের কাছে রেখে দেয় (রিটেইনড আর্নিংস) এবং সেই টাকা দিয়ে অন্য কোনো লাভজনক কোম্পানি কিনে নেয় অথবা নতুন ভালো স্টকে বিনিয়োগ করে। বাফেট ও তাঁর দল দশকের পর দশক ধরে সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি হারে এই টাকার ওপর রিটার্ন বা মুনাফা তৈরি করে আসছেন। ফলে টাকাটা ডিভিডেন্ড হিসেবে না পেয়ে কোম্পানির ভেতরে থাকায় তা চক্রবৃদ্ধি হারে বহুগুণ বড় তহবিলে পরিণত হয়েছে।

কর সাশ্রয়

ডিভিডেন্ড দেওয়া হলে বিনিয়োগকারীদের সেই আয়ের ওপর সরাসরি ট্যাক্স বা কর দিতে হয়। কিন্তু কোম্পানি যদি ডিভিডেন্ড না দিয়ে সেই টাকা ব্যবসার বৃদ্ধিতে খাটায়, তবে শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পায় (ক্যাপিটাল গেইন)। শেয়ার বিক্রি না করা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীকে কোনো ট্যাক্স দিতে হয় না। বাফেটের মতে, ডিভিডেন্ড দিয়ে সরকারের কাছে ট্যাক্স দেওয়ার চেয়ে সেই টাকা কোম্পানির ভেতরে রেখে ট্যাক্স-ফ্রি উপায়ে বৃদ্ধি করা বিনিয়োগকারীদের জন্যই বেশি লাভজনক।

বাফেটের “সেল-অফ” তত্ত্ব

বিনিয়োগকারীদের যাঁদের নিয়মিত ক্যাশ বা খরচের টাকার প্রয়োজন, তাঁদের জন্য বাফেটের পরামর্শ হলো ডিভিডেন্ডের আশায় না থেকে প্রতি বছর নিজের পোর্টফোলিও থেকে সামান্য কিছু শেয়ার (ধরা যাক ১% বা ২%) বিক্রি করে দেওয়া। যেহেতু কোম্পানিটি ডিভিডেন্ড না দিয়ে পুরো টাকাটাই রি-ইনভেস্ট করছে, তাই শেয়ারের অভ্যন্তরীণ মূল্য অনেক দ্রুত গতিতে বাড়ছে। ফলে সামান্য কিছু শেয়ার বিক্রি করার পরও বছর শেষে বিনিয়োগকারীর মোট সম্পদের মূল্য ডিভিডেন্ড দেওয়া কোম্পানির চেয়ে বেশি থাকে এবং ট্যাক্সও কম লাগে।

শেয়ার পুনঃক্রয়

নগদ টাকা সরাসরি শেয়ারহোল্ডারদের হাতে তুলে দেওয়ার চেয়ে বাফেট “শেয়ার বাইব্যাক” বা নিজেদের শেয়ার বাজার থেকে নিজেদের টাকা দিয়ে কিনে নেওয়া বেশি পছন্দ করেন। যখন বার্কশায়ার তার নিজের শেয়ার বাজার থেকে কিনে নেয়, তখন বাজারে কোম্পানির মোট শেয়ারের সংখ্যা কমে যায়। এর ফলে কোনো টাকা খরচ না করেই বাকি থাকা শেয়ারহোল্ডারদের কোম্পানির ওপর মালিকানার অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায়।

শেয়ারহোল্ডারদের রায়

বাফেটের এই নীতি যে শুধু তাঁর একার চাপিয়ে দেওয়া, তা কিন্তু নয়। ২০১৪ সালে বার্কশায়ারের সাধারণ সভায় বিনিয়োগকারীদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তাঁরা ডিভিডেন্ড চান কি না। তখন ৯৮% শেয়ারহোল্ডার ডিভিডেন্ড না দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। কারণ তাঁরা জানেন, টাকাটা তাঁদের নিজেদের পকেটে রাখার চেয়ে ওয়ারেন বাফেটের হাতে ছেড়ে দেওয়া অনেক বেশি নিরাপদ এবং লাভজনক।

বাফেটের উত্তরসূরি এবং বর্তমান সিইও গ্রেগ অ্যাবেলও একই নীতি বজায় রেখেছেন এবং স্পষ্ট জানিয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা ১ ডলার দিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য তার চেয়ে বেশি মার্কেট ভ্যালু তৈরি করতে পারবেন, ততক্ষণ বার্কশায়ার কোনো ডিভিডেন্ড দেবে না।

মন্তব্য

আমাদের বাজারেও অনেক কোম্পানি আছে যারা ভালো আয় করেও বিনিয়োগকারীদের ভালো ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয় না। তারা ব্যবসায় টাকা পুনঃবিনিয়োগ করে। কিন্তু অধিকাংশ কোম্পানি এই পুনঃবিনিয়োগ থেকে যথেষ্ট মুনাফা জেনারেট করতে পারে না। উলটো কোম্পানির সম্পদ ধ্বংস করে। গুটি কয়েক কোম্পানি আছে যারা বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড কম দিয়ে বাকি টাকা ব্যবসায় পুনঃবিনিয়োগ করে সম্পদ তৈরি করছে। সেই সম্পদ কোম্পানির জন্য পরের বছর আরও বেশি আয় করছে। এমন আর্নিং কম্পাউন্ডারের খোজ পেলে সাহস করে সেখানে বিনিয়োগ করুন। কে জানে ওই কোম্পানি হয়তো এক সময় আপনার জন্য বাংলার মিনি বার্কশায়ার হাথওয়েই হয়ে উঠতে পারে!!

বিনিয়োগকারীদের আয়ের পুরোটা না দিয়ে পুনঃবিনিয়োগ করেই স্কয়ার, রেনাটা, অলিম্পিক, ব্রাক ব্যাংক, আজকে এত বড় হয়েছে। পুনঃবিনিয়োগ করেও যথেষ্ট মুনাফা জেনারেট করতে না পারায় সিংগার, কনফিডেন্স সিমেন্ট, এসিআই বিনিয়োগকারীদের হতাশা বাড়াচ্ছে। আবার পুনঃবিনিয়োগ করা টাকা ধ্বংস করে ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, এক্টিভ ফাইন, এফসি হেলথ বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়েছে।

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, শেলটেক ব্রোকারেজ লিমিটেড

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer