পর্ব-২
জীবন হতে হবে অর্থপূর্ণ
আমরা কি একটু উদার হতে পারি? আমরা কি উদারতার চর্চা করতে পারি? আসলে উদারতা এবং উদারতার চর্চা আমাদের জীবনে বহুমাত্রিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে। আমরা যদি আমাদের চারপাশে একটু লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যাবে আমাদের অনেকের মধ্যেই এই উদারতা নেই। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যার মধ্যে নেই, তিনি চর্চা করবেন কিভাবে? আমি মনে করি কোনো কিছু চর্চা করতে হলে সেটা নিজের মধ্যে থাকতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নিজের মধ্যে উদারতার ভান্ডার তৈরি করার জন্য একটু চর্চাই যথেষ্ট। উদার হওয়া মানে এই নয়, মানুষকে টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করতে হবে। উদারতা মানে এই নয় বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মীদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতে হবে। উদারতা অনেকভাবে দেখানো যায়। অনেক সময় সামান্য সেক্রিফাইস করেও উদারতা দেখানো যায়। কখনো কখনো সামান্য উদারতাও কারও কারও কাছে ভালোলাগার বিষয়ে পরিণত হতে পারে। ছোট্ট একটি ঘটনা শেয়ার করি।
আমি সব সময় গ্রোসারি আইটেমগুলো একটি দোকান থেকে কিনি। ফলে দোকানের ছেলেটা আমাকে খুব ভালো মতো চিনে। আমি একদিন দোকানে কিছু জিনিস কিনতে গিয়েছি। দোকানের ছেলেটা আমি যা যা বলেছি সেগুলো রেডি করছিল। এমন সময় একজন ভদ্রলোক এসে কিছু একটা কিনতে চাচ্ছিলেন। ছেলেটি ভদ্রলোকের দিকে মনোযোগ দিচ্ছিল না। বিষয়টি আমার কাছে দৃষ্টিকটু মনে হলো। ছেলেটির উদ্দেশ্য আমার সবকিছু দিয়ে তারপর ভদ্রলোকের দিকে মনোযোগ দেবে। আমি জানি ছেলেটা কেন ভদ্রলোকের প্রতি মনোযোগ দিচ্ছিল না। ওই দোকান থেকে আমি নিয়মিত কেনাকাটা করি। তাছাড়া পরিমাণেও বেশি। দোকানদারের দৃষ্টিকোণ থেকে আমি হয়তো ওর গুড কাস্টমার। আমি নিজে ছেলেটিকে বললাম ভদ্রলোকের জিনিসটি তুমি আগে দাও। আমার সবকিছু দিতে তোমার সময় লাগবে। তিনি কেন দাঁড়িয়ে থাকবেন। আমি ইচ্ছে করলে এটা না বললেও পারতাম। তারপরেও বলেছি। কারণ আমি নিজেই অস্বস্তি বোধ করছিলাম। এটা আমার বিশাল কোনো উদারতা না, কিন্তু উদারতা। আমি ওইটুকু উদারতা দেখিয়েছিলাম বলে ভদ্রলোক তাড়াতাড়ি তাঁর জিনিসটি কিনতে পেরেছিলেন। আমার প্রতি তাঁর এক ধরনের ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হলো। এটাও তো আমার জন্য এক ধরনের প্রাপ্তি। চলার পথে আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। আমরা যদি একটু উদার হতে পারি তাহলে কারও না কারও জীবনে সেটা উপকারে আসবে।
এটা ধ্রুব সত্য, জীবনে চলার পথে সবকিছু আমার মতো হবে না। অনেক কিছু আমার পছন্দ হবে না। আবার অনেক কিছু পছন্দ হবে। হয়তো কারও কারও জীবনে অপছন্দের তালিকাটা বড়। এটার পেছনে কারণ হতে পারে তাঁর মধ্যে উদারতার পরিমাণ কম। এই কম হওয়ার অনেকগুলো নেতিবাচক দিক রয়েছে। যে নিজেকে উদারতার চাদরে ঢেকে ফেলতে পারে তাঁর মনে দুঃখ-কষ্ট কম থাকে। কারণ তিনি সেক্রিফাইস করতে পারেন। এই সেক্রিফাইসের কারণে তাঁর মনে না পাওয়ার বেদনা খুব একটা বাসা বাধতে পারে না। তাঁর মনে দুঃখ-যন্ত্রণা কম থাকে বিধায় মানসিকভাবে তিনি সুস্থ থাকেন। ফলে শারীরিকভাবেও তিনি সুস্থ থাকেন। অন্যদিকে উদারতার কমতি থাকলে মনে দুঃখ-যন্ত্রণা বেড়ে যায়। এক সময় শরীরের মধ্যে হাই-প্রেসার বাসা বাধে। কারও কারও ডায়াবেটিস হয়। আর এ দুটি হলে অন্য কোনো রোগ শরীরে যেকোনো সময় চলে আসতে পারে। এই যে মানসিক এবং শারীরিক অসুস্থতা এ দুটি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে উদারতা বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা অনেক সময় একটি কথা শুনি, “আমার তো কোনো অসুখ নেই। তোমার সুখ আমার অসুখ”। এ ধরনের অসুখ থেকে বাঁচতে হলে নিজের মধ্যে উদারতার চর্চা করতে হবে। উদারতা পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে। উদারতা পারিবারিক এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে।
ইংরেজিতে দুটি শব্দ আছে। সিমপ্যাথি এবং এমপ্যাথি। আমরা যদি সিমপ্যাথি না দেখিয়ে এমপ্যাথেটিক হতে পারি তাহলে সেটা মানবিক গুণাবলীকে বিকশিত করতে সাহায্য করে। কারও দুঃখ-কষ্টে সহানুভূতি প্রকাশ করাকে ইংরেজিতে সিমপ্যাথি বলে। অন্যদিকে কারও দুঃখ-কষ্টকে নিজের দুঃখ-কষ্ট হিসেবে অনুভব করাকে এমপ্যাথেটিক বলে। মনে করুন একজন ব্যক্তির ভাই মারা গেলেন। আমি তাঁর এই কষ্টের সময় তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখাতেই পারি। এটাই হলো সিমপ্যাথি। তিনি তাঁর ভাইকে হারিয়েছেন। যদি আমার কোনো ভাই মারা যেত তাহলে আমার মনের অবস্থা কেমন হতো সেটা উপলব্ধি করে তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়াকে বলে এমপ্যাথি।
প্রতিদিন অনেক মানুষের সাথে আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছে। কথাবার্তা হচ্ছে। কখনো কর্মস্থলে, কখনো রাস্তায়, কখনো হাটে-বাজারে, অনুষ্ঠানে কিংবা নানা জায়গায়। আমরা চলার পথে এই মানুষগুলোর সাথে ইচ্ছে করলে কর্কশ ভাষায় কথা বলতে পারি। গোমরা মুখ করে থাকতে পারি। আবার ইচ্ছে করলেই হাসিখুশি প্রাণবন্ত থাকতে পারি। মিষ্ট ভাষায় কথা বলতে পারি। আমরা যদি দ্বিতীয় পন্থাটি গ্রহণ করি তাহলে মানুষের কাছে আমার পরিচয় হবে একরকম। আর প্রথমটি বেছে নিলে মানুষ আমাকে চিনবে, জানবে অন্যভাবে। প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম মানুষের উপকার করার জন্য সব সময় টাকার প্রয়োজন হয় না। একটু পরামর্শ দিয়ে, একটু তথ্য দিয়ে, হাসিমুখে কথা বলেও মানুষের মন জয় করা যায়। আমরা এখন এক অস্থির সময় পার করছি। সকলেই ঝড়ের বেগে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অস্থিরতায় ভুগছি। আমাদের মনে হয় এই গতি থামানো উচিত। থামাতে না পারলে অন্তত কমানো উচিত। কারণ ছুটে চলা গতি বাড়াবে। কিন্তু জীবন থেকে যা কেড়ে নেবে তা কখনো ফিরে আসবে না।
(সমাপ্ত)
মোহাম্মদ আব্দুর রউফ
সিইও, ইন বাটন লিমিটেড