পর্ব- ১৮
ব্যাংকের ব্র্যান্ডিং: আমার যত অভিজ্ঞতা
সিটি থেকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে
“হেয়ার ফর গুড” এই ট্যাগলাইন দিয়ে তখন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক পুরো পৃথিবীতেই একটি বার্তা দিতে চেয়েছিল। ওই বার্তার মূল কথা ছিল স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক মানেই ক্রেতাদের জন্য ভালো, কমিউনিটির জন্য ভালো, প্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো, দেশের জন্য ভালো এবং দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো। এক কথায় সবকিছুর জন্য ভালো। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ব্যাংকিং করা মানেই তাঁর জন্য সেটা ভালো। এই ব্যাংক যে দেশেই ব্যবসা পরিচালনা করুক না কেন সেই দেশের সবকিছুর জন্যই ভালো। ওই সময়ে দেওয়া এই ট্যাগলাইনটির মর্মকথা উপলব্ধি করলে বুঝা যায় কত সুদূরপ্রসারী চিন্তা করলে একটি প্রতিষ্ঠান এই ধরনের ট্যাগলাইন ব্যবহার করতে পারে। এখানে “ফর গুড” এর আরেকটি অর্থ ছিল “সব সময়ের জন্য।” এখানেও ওই সুদূরপ্রসারী চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। এ কারণে আজো বোধকরি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ব্যাংকিং সেবায় বাংলাদেশে শীর্ষস্থান নিজেদের দখলে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আমরা যখন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করেছি তখন “হেয়ার ফর গুড” এর মর্মকথা বা মর্মবাণী ধারণ করেই কাজ করেছি। ওই সময়ে আমরা বৈশাখী উৎসব করেছি। অ্যামপ্লয়ী ডে করেছি। আমরা “ডাইভারসিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন” ইভেন্ট করেছি। গল্ফ প্রোগ্রাম করেছি। প্রায়োরিটি কাস্টমারদের নিয়ে ইভেন্ট করেছি। আমাদের কাস্টমারদের মধ্য থেকে টপ অব দ্যা টপ বাছাই করে তাঁদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের মতো করে প্রোগ্রাম করেছি। পরবর্তীতে দেখেছি ওই প্রোগ্রামগুলো আমাদের বিজনেসের ওপর দারুণভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিজনেস অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কমিউনিকেশন যে ব্যবসায়ের পরিধি বাড়াতে সহায়তা করতে পারে তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে প্রায়োরিটি ব্যাংকিং ধারণাকে পুনরায় কাস্টমারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওই সময়ের আমাদের কার্যক্রমগুলো।
আমরা ওই সময়ে “প্রেফার্ড ব্যাংকিং” শুরু করেছিলাম। এটি মূলত জেনারেল ব্যাংকিং এবং প্রায়োরিটি ব্যাংকিং এই দুই শ্রেণির গ্রাহকদের মাঝামাঝি পর্যায়ে যে সকল গ্রাহক রয়েছেন তাঁদের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। এখন সম্ভবত এই সেগমেন্টটি নেই। কিন্তু ওই সময়ে বাজারের চাহিদার কারণেই ওটা করেছিলাম। প্রায় দেড় বছর সময়ের মধ্যে ওই কাজগুলো করেছিলাম। আমরা ষোলো সতেরোটি ফিন্যান্সিয়াল কিয়স্ক করেছিলাম। এই কিয়স্কগুলো ব্যাংকও না আবার শুধু এটিএম বুথও না। ব্যাংক ও এটিএম বুথ এই দুটির মাঝামাঝি একটি বিষয় ছিল। কোনো ক্যাশ কাউন্টার ছিল না। একটি সার্ভিস সেন্টার ছিল। পাশাপাশি এটিএম ছিল। এটিএম এর সব ধরনের সুবিধাই গ্রাহকরা ভোগ করতে পারতেন। কিয়স্কগুলো স্থাপনে আমরা সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের বসবাসের এলাকাগুলো বেছে নিয়েছিলাম। রামপুরা, পান্থপথ, বনশ্রী এই ধরনের এলাকাগুলোতে কিয়স্কগুলো ছিল।
আমরা ওই সময়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি একটি প্রতিষ্ঠান যদি সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিংয়ের কাজগুলো করতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানের টার্গেট কাস্টমারদের নীডগুলো পূরণ করতে পারে তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানের সামনে এগিয়ে যাওয়া কিংবা ব্যবসাকে একটি ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া অসম্ভব কিছু নয়। আমরা যখন কাজ করেছি তখন এদেশের মোট ব্যাংক ব্যবসায়ের পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি অংশ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড দখল করে রেখেছিল। এখন দেশিয় ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তথাপি মার্কেট যাচাই করলে দেখা যাবে ব্যাংক ব্যবসায়ের শীর্ষস্থান স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের দখলে। এদেশে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভালো করার বা এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো ওরা মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং এবং সেলস এর কাজগুলো যেভাবে করা প্রয়োজন ঠিক সেভাবেই করে। কিন্তু আমাদের দেশিয় কোম্পানিগুলো এই কাজগুলো ওদের মতো বা যেভাবে করা প্রয়োজন ঠিক সেভাবে করতে পারে না। এ কারণেই আমরা ওদের মতো ব্যবসা করতে পারি না।
আজকে যেটাকে আমরা কন্টাক্ট সেন্টার বা কল সেন্টার বলছি সেটাও ওই সময়ে আমরাই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে শুরু করেছিলাম। কল সেন্টারের জন্য আমাদের ট্যাগলাইন ছিল “ওয়ান কল, দ্যাটস অল” অর্থাৎ কাস্টমারের একটি কলই তাঁর সকল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাওয়া। অন্যদিকে যাঁরা কল সেন্টারে কর্মরত ছিল তাঁদের মোটিভেশন দেওয়ার জন্য একটি বাক্য আমরা তৈরি করেছিলাম যেখানে বলা হতো “ইটস ইউর কল” অর্থাৎ এই একটি বাক্য দিয়েই তাঁদের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হতো।
(চলবে)
আফতাব মাহমুদ খুরশিদ কর্পোরেট জগতে অতি পরিচিত নাম| অনেকের কাছে তিনি পরিচিত ব্র্যান্ড ক্যাটালিস্ট হিসেবে| ২০০৭ সালে তিনি পেয়েছেন ব্র্যান্ড লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্ট থেকে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন| অতপর যুক্তরাজ্য থেকে মার্কেটিংয়ে এমবিএ| দেশের বিভিন্ন বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বহুজাতিক কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর| স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, সিমেন্স, এসিআই, বাংলালায়ন, রেডিও টুডে, প্রাইড, ট্রাস্ট ব্যাংক, বেঙ্গল গ্রুপ, অ্যাপোলো হাসপাতাল, এসএসজি, সিটি ব্যাংকসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করেছেন| এছাড়া দেশে-বিদেশে ব্র্যান্ড সম্পর্কিত বিভিন্ন কনফারেন্সে যোগদান করেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন|