Global Header Bottom
শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত, বাস্তবতা ও উত্তরণের কৌশল

কিউএস সূচকের আলোকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা

শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত, বাস্তবতা ও উত্তরণের কৌশল

শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত, বাস্তবতা ও উত্তরণের কৌশল

বিশ্বায়নের যুগে উচ্চশিক্ষা কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, জ্ঞান-অর্থনীতি, গবেষণা সক্ষমতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম সূচক| বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণে যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো কিউএস র‌্যাংকিং| কিউএস বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা, গবেষণা, আন্তর্জাতিকীকরণ, কর্মসংস্থান সক্ষমতা এবং একাডেমিক খ্যাতিসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান নির্ধারণ করে থাকে|


এই সূচকগুলোর মধ্যে “ফ্যাকাল্টি-স্টুডেন্ট রেশিও” বা শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড| কারণ, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা যত কম হয়, তত বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা, তত্ত্বাবধান, গবেষণা সহায়তা এবং মানসম্মত শিক্ষাদান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়| উন্নত বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই সূচকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে| বিপরীতে বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে|


বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও গুণগত মান উন্নয়নের প্রশ্নে এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান| বিশেষত শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতের ভারসাম্যহীনতা শিক্ষার মান, গবেষণার পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে| এই প্রবন্ধে কিউএস সূচকের আলোকে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতের গুরুত্ব, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা, এর বহুমাত্রিক প্রভাব এবং উত্তরণের কার্যকর কৌশল বিশদভাবে আলোচনা করা হবে|


কিউএস র‌্যাংকিংয়ে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতকে শিক্ষার মানের একটি কার্যকর সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়| কারণ এটি সরাসরি শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কযুক্ত| ছোট ব্যাচভিত্তিক ক্লাস শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সুযোগ বৃদ্ধি করে, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা গড়ে তোলে এবং ইন্টার-অ্যাকটিভ শিক্ষা নিশ্চিত করে| একইসাথে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা করতে পারেন| এর বিপরীতে বৃহৎ ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকের যোগাযোগ সীমিত হয়ে যায়, মূল্যায়নের মান কমে যায় এবং গবেষণামুখী শিক্ষা ব্যাহত হয়| বর্তমানে বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় শুধু ডিগ্রি প্রদান নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদ ˆতরি, গবেষণা উৎপাদন এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে| এ কারণে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত একটি কৌশলগত একাডেমিক সূচকে পরিণত হয়েছে| উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই সূচক আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে না পারলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে| বাংলাদেশের মতো দেশে কিউএস সূচকের এই ধারণা উচ্চশিক্ষা সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারে|


বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার গত দুই দশকে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারের সুযোগ অনেক বেড়েছে| কিন্তু এই সম্প্রসারণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণা অবকাঠামো এবং একাডেমিক সক্ষমতা উন্নয়ন না হওয়ায় শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে| দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে যোগ্য ও পূর্ণকালীন শিক্ষক নিয়োগ হয়নি| ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে|


সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই সংকট তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এর মতো বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর চাপ অত্যন্ত বেশি| অনেক বিভাগে একটি শ্রেণিকক্ষে শতাধিক শিক্ষার্থীকে পাঠদান করতে হয়, যা কার্যকর শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থী তত্ত্বাবধানকে কঠিন করে তোলে| একজন শিক্ষককে একাধিক কোর্স পরিচালনা, পরীক্ষা মূল্যায়ন, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং গবেষণাকর্ম একসাথে সামলাতে হয়| এর ফলে গবেষণার সময় কমে যায় এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় একাডেমিক সহায়তা সীমিত হয়ে পড়ে| বিশেষত গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা, থিসিস তত্ত্বাবধান এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মেন্টরিং এই পরিস্থিতিতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়|


বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই ধরনের সমস্যা বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান| কিছু শীর্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার চেষ্টা করলেও অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চায়| ফলে সেখানে পূর্ণকালীন শিক্ষকের পরিবর্তে খণ্ডকালীন শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পায়| এতে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়| একইসাথে গবেষণা কার্যক্রমও সীমিত থাকে| বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গবেষণা সংস্কৃতির দুর্বলতা, ডক্টরেটধারী শিক্ষকের ¯^ল্পতা, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা সুবিধার অভাব এবং বিদেশমুখী মেধাপ্রবাহ এই সংকটকে আরও জটিল করেছে| এই বাস্তবতা শুধু শিক্ষার গুণগত মানকেই প্রভাবিত করছে না; বরং আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়েও বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে তুলছে| কিউএস র‌্যাংকিংয়ে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়ায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে| এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কর্মসংস্থান, গবেষণা উৎপাদন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপরও পড়ছে| তাই শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতের বর্তমান সংকটকে শুধু প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও ˆবশ্বিক প্রতিযোগিতার সাথে সম্পর্কিত একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন|


বাংলাদেশে শিক্ষক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ পরিকল্পনার অভাব| নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং নতুন বিভাগ চালুর ক্ষেত্রে অনেক সময় পর্যাপ্ত শিক্ষক সরবরাহ, গবেষণা সক্ষমতা কিংবা অবকাঠামোগত প্রস্তুতির বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয় না| ফলস্বরুপ একটি বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করলেও সেখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক পূর্ণকালীন শিক্ষক থাকে না| অনেক বিভাগে সীমিতসংখ্যক শিক্ষককে অতিরিক্ত কোর্স পরিচালনা করতে হয়, যা শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করে|


গবেষণা পরিবেশের সীমাবদ্ধতাও শিক্ষক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ| বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য উন্নত ল্যাবরেটরি, পর্যাপ্ত অনুদান, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবেশাধিকার এবং গবেষণা সহায়ক পরিবেশ বিদ্যমান থাকলেও বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব সুযোগ সীমিত| ফলে অনেক মেধাবী তরুণ গবেষক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন| আবার যাঁরা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশে যান, তাঁদের একটি অংশ উন্নত সুযোগ-সুবিধার কারণে দেশে ফিরে আসেন না| এই “ব্রেইন ড্রেইন” বা মেধাপ্রবাহ দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করছে|


একইসাথে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবও সংকটকে গভীর করেছে| অনেক সময় মেধা, গবেষণা দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনার পরিবর্তে অন্যান্য বিষয় প্রাধান্য পাওয়ার অভিযোগ ওঠে| এতে প্রকৃত মেধাবীরা নিরুৎসাহিত হন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিযোগিতামূলক একাডেমিক পরিবেশ গড়ে ওঠে না| শিক্ষকতার পেশাগত মর্যাদা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে বেতন কাঠামো, গবেষণা অনুদান এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় সীমিত হওয়ায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা কর্পোরেট খাত বা বিদেশমুখী পেশার দিকে ঝুঁকে পড়েন|


অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিও শিক্ষক সংকটকে তীব্র করে তুলেছে| বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেকেই অবকাঠামো ও শিক্ষক সক্ষমতা বিবেচনা না করেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করছে| এর ফলে সীমিতসংখ্যক শিক্ষককে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী সামলাতে হচ্ছে| বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকের ওপর পাঠদান, পরীক্ষা মূল্যায়ন, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং গবেষণার বহুমুখী চাপ সৃষ্টি হয়| অন্যদিকে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক উন্নয়নকে সীমিত করে| সব মিলিয়ে শিক্ষক সংকট বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত সমস্যা, যার সাথে পরিকল্পনা, অর্থায়ন, গবেষণা সংস্কৃতি, নিয়োগ নীতি এবং জাতীয় শিক্ষানীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে| এই সংকট সমাধানে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে না|


অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসংখ্যা শিক্ষার মানকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে| একটি শ্রেণিকক্ষে যখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা অত্যধিক হয়, তখন শিক্ষক প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিতে পারেন না| ফলে পাঠদান অনেকাংশে একমুখী বক্তৃতাভিত্তিক হয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হয়| সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, শ্রেণিকক্ষ আলোচনা এবং সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ে| শিক্ষার্থীরা অনেক সময় নিজেদের একাডেমিক দুর্বলতা নিয়ে শিক্ষকের সাথে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করার সুযোগও পায় না|


শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতের ভারসাম্যহীনতা গবেষণা কার্যক্রমকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে| একজন শিক্ষককে যখন অতিরিক্ত কোর্স পরিচালনা, পরীক্ষা মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়, তখন গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময় অবশিষ্ট থাকে না| ফলে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশনা কমে যায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে| বিশেষত কিউএস এর মতো আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে গবেষণা এবং একাডেমিক সুনামের গুরুত্ব বেশি হওয়ায় এই সমস্যা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ˆবশ্বিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে| একইসাথে মূল্যায়ন পদ্ধতির গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়| বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর খাতা, অ্যাসাইনমেন্ট এবং গবেষণাপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকরা পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না| এর ফলে মূল্যায়নের নির্ভুলতা ও মান নিয়ে প্রশ্ন ˆতরি হয়| অনেক সময় শিক্ষার্থীরা যথাযথ ফিডব্যাক থেকে বঞ্চিত হয়, যা তাঁদের একাডেমিক উন্নয়নকে সীমিত করে| গবেষণাভিত্তিক থিসিস বা প্রজেক্ট তত্ত্বাবধানও এই পরিস্থিতিতে দুর্বল হয়ে পড়ে|


শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতের নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষার্থীদের মানসিক ও পেশাগত উন্নয়নেও পড়ে| অতিরিক্ত শিক্ষার্থী সংখ্যার কারণে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, মেন্টরিং এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সীমিত হয়ে যায়| ফলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে পড়ে| অন্যদিকে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ মানসিক ক্লান্তি ও পেশাগত হতাশা ˆতরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার গুণগত মানকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে| এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণ এবং গবেষণা অর্থায়নের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে| বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা, গবেষণা সহায়তা এবং কার্যকর মেন্টরিং ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়| বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতের ভারসাম্য উন্নয়ন করতে না পারে, তাহলে ˆবশ্বিক উচ্চশিক্ষা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে| তাই এই সমস্যাকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি নির্মাণের একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন|


বিশ্বের উন্নত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাগুলোতে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতকে শিক্ষার গুণগত মানের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়| অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কিংবা সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এর মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছোট ব্যাচভিত্তিক ক্লাস, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা, মেন্টরিং ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক পাঠদানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়| এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা কেবল পাঠদানই করেন না; বরং গবেষণা, উদ্ভাবন এবং ব্যক্তিগত একাডেমিক তত্ত্বাবধানেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন| একইসাথে উন্নত গবেষণাগার, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শিক্ষক-ছাত্র ভারসাম্যকে কার্যকর রাখে| এশিয়ার অনেক দেশ, বিশেষত সিঙ্গাপুর, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া, উচ্চশিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে| বাংলাদেশের জন্য এসব অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে| শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং গবেষণা সক্ষমতা, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য| আন্তর্জাতিক বাস্তবতা প্রমাণ করে যে মানসম্মত উচ্চশিক্ষা গড়ে তুলতে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতের ভারসাম্য রক্ষা অপরিহার্য|


বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত উন্নয়নের জন্য সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ প্রয়োজন| প্রথমত, জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবসম্মত উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনা ˆতরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থী ভর্তি, শিক্ষক নিয়োগ এবং গবেষণা উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হবে| দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গবেষণামুখী ও দক্ষ শিক্ষক তৈরি হয়| একইসাথে পিএইচডি স্কলারশিপ, গবেষণা অনুদান এবং আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন|


আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থাও শিক্ষকদের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে| অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষাসহায়ক প্রযুক্তি শিক্ষার মান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে| বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে| একইসাথে শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ালে গবেষণা অর্থায়ন এবং বাস্তবমুখী দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে| সর্বোপরি “সংখ্যাভিত্তিক সম্প্রসারণ” থেকে “মানভিত্তিক উন্নয়ন”-এর দিকে অগ্রসর হওয়াই হওয়া উচিত বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নীতির প্রধান কৌশল|


বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতের ভারসাম্য রক্ষায় এখনও নানা সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান| অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চায়, ফলে পূর্ণকালীন শিক্ষকের ঘাটতি ˆতরি হয় এবং খণ্ডকালীন শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পায়| এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক তত্ত্বাবধান ও গবেষণা সংস্কৃতিকে দুর্বল করে| বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত গবেষণামুখী পূর্ণকালীন শিক্ষক নিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ, গবেষণা অনুদান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ ˆতরি করা| একইসাথে শিক্ষার্থীসংখ্যা নির্ধারণে অবকাঠামো ও শিক্ষক সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে| আধুনিক ল্যাবরেটরি, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং শিক্ষার্থী সহায়তা সেবা উন্নয়নও জরুরি| আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথ গবেষণা, শিক্ষক বিনিময় এবং একাডেমিক অংশীদারিত্ব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নে সহায়ক হতে পারে| কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে প্রবেশের চেষ্টা করছে, যা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত| তবে সামগ্রিকভাবে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক একাডেমিক সংস্কৃতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে|


আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, ডিজিটাল রিসোর্স এবং গবেষণা অনুদানের সীমাবদ্ধতা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে| এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, বিভাগভিত্তিক জনবল পরিকল্পনা, প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস এবং গবেষণা সহায়তা বৃদ্ধি জরুরি| একইসাথে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে ¯^চ্ছতা ও একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানোন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে|


বর্তমানে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও সম্ভাবনার ক্ষেত্রও কম নয়| দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, উচ্চশিক্ষার প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সম্প্রসারণ ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ভিত্তি ˆতরি করেছে| যদি শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত উন্নয়ন, গবেষণায়


বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে| ইতোমধ্যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, গবেষণা এবং একাডেমিক কার্যক্রমে অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা আশাব্যঞ্জক| কিউএস-এর মতো আন্তর্জাতিক সূচকে উন্নতি করতে হলে শুধু অবকাঠামো নয়, বরং গবেষণা সংস্কৃতি, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে| একইসাথে বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণ, আন্তর্জাতিক গবেষণা অংশীদারিত্ব এবং শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন| বাংলাদেশ যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষাকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করতে পারে, তাহলে আগামী এক দশকে দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষা মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে|


কিউএস সূচকের আলোকে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত কেবল একটি পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়; বরং এটি উচ্চশিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা সক্ষমতা এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন| বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে গত দুই দশকে ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটলেও সেই তুলনায় শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণা অবকাঠামো এবং একাডেমিক মানোন্নয়ন পর্যাপ্তভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি| এর ফলে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতের ভারসাম্যহীন শিক্ষাদান, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে|


বর্তমান বাস্তবতায় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য| এজন্য প্রয়োজন মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনা| একইসাথে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উভয় ক্ষেত্রেই গুণগত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে| আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে দক্ষ শিক্ষক, গবেষণামুখী পরিবেশ এবং সুষম শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত ছাড়া বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা সম্ভব নয়| তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে ˆবশ্বিক মানে উন্নীত করতে হলে এখনই পরিকল্পিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য|

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer