কর্মীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিং
পর্ব- ১
ব্র্যান্ডিং শব্দটি মূলত মার্কেটিংয়ের সাথে জড়িত। কোনো কিছুকে ব্র্যান্ডিং করা হলে সেখানে স্বতন্ত্র একটি পরিচয় ফুটে উঠে। ব্র্যান্ডিং ধারণাটি শুধু পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পণ্যের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানকেও ব্র্যান্ডিং করা জরুরি। কারণ প্রতিষ্ঠানের সাথে অনেকগুলো পক্ষ জড়িত। একটি প্রতিষ্ঠানকে এর স্টেকহোল্ডার, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মীবৃন্দ, বিভিন্ন সরবরাহকারি, ক্রেতা, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ অপরাপর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে কাজ করতে হয়। এ সকল পক্ষগুলোর নিকট প্রতিষ্ঠানের ইমেজ যদি ভালো হয় তাহলে তা প্রতিষ্ঠানের জন্য কল্যাণকর। এই পক্ষগুলো প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে মূল্যায়ন করে সেটাই আসল। তাদের নিকট থেকে প্রতিষ্ঠান যদি অকুন্ঠ প্রশংসা অর্জন করতে পারে তাহলে তা প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রার পথকে সহজ করে দেয়।
ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় যোগ্যকর্মী নিয়োগ করতে চায়। শুধু কর্মী বাছাইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিং করা হয় না। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার জন্যও ব্র্যান্ডিং প্রয়োজন। কারণ, যাঁরা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তাঁরা যদি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা স্থাপন করতে না পারেন তাহলে অপরাপর পক্ষগুলো কখনো আস্থা স্থাপন করতে পারবে না। তাই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিকট প্রতিষ্ঠানকে সবার আগে ব্র্যান্ডিং করা প্রয়োজন। আর এই কাজটি শুরু হওয়া প্রয়োজন কর্মী নিয়োগের মধ্যদিয়ে।
প্রতিষ্ঠানকে ব্র্যান্ডিং করার জন্য প্রথমেই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি হওয়া উচিত শতভাগ স্বচ্ছ। একইসাথে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আধুনিক পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা প্রয়োজন। নিয়োগ প্রক্রিয়াটি যেন বিতর্কিত না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। কিভাবে তা প্রশংসিত হতে পারে সেটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। অনলাইন বা নিউজপেপার যেখানেই বিজ্ঞাপন দেওয়া হোক না কেন সেখানে প্রতিষ্ঠানের স্ট্রেংথ তুলে ধরতে হবে। একটি বিজ্ঞাপনের মধ্যে অনেকগুলো অংশ থাকে। যেমন শিরোনাম, বিন্যাস, রঙ এর ব্যবহার, বাক্যগঠন, শব্দচয়ন, ছবির ব্যবহার ইত্যাদি। এই অংশগুলোর উপস্থাপন দেখে বুঝা যায় প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে পেশাদারত্ব মনোভাব কতটুকু বিদ্যমান। প্রিন্ট মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান কোন নিউজপেপারটি বেছে নিচ্ছে তা থেকেও একটি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। আমরা যখন কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বা দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখি তখন পেশাদারত্ব বিষয়গুলোর উপস্থিতি দেখতে পাই। অপ্রিয় হলেও সত্য, আমাদের দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে এই বিষয়গুলো খুঁজে পাওয়া যায় না।
একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কয়েকটি ধাপ থাকতে পারে। যেমন, লিখিত পরীক্ষা, একাধিক মৌখিক পরীক্ষা, ডাক্তারী পরীক্ষা ইত্যাদি। প্রতিটি ধাপই প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য জরুরি। যাঁরা পরীক্ষায় অংশ নেবে তাঁরা যেন খুব সহজেই আস্থা স্থাপন করতে পারে যে, তাঁদের যোগ্যতার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে। অংশগ্রহণকারী অনেকেই চাকরি পাবে না। বাদ পড়ে যাবে। কিন্তু, তাঁদের মনে যেন এটুকু বিশ্বাস থাকে প্রতিষ্ঠান কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়নি। আমাদের দেশে যাঁরা বাদ পড়ে যায় তাঁরা সাধারণত প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ফিডব্যাক পায় না। অনেকে দিনের পর দিন অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণকারীদের বলতে পারে কতদিনের মধ্যে তাঁরা পজিটিভ বা নেগেটিভ বার্তা পাবে।
একটি এসএমএস বা মেইল করে প্রত্যেককে জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এ ধরনের কার্যক্রম প্রতিষ্ঠানের ইমেজকে বাড়িয়ে দেয়। কেউ যদি চাকরি নাও পায় তাহলেও তিনি এই নিয়মগুলোর কথা প্রচার করে বেড়াবে। তাঁর মনে এই প্রতিষ্ঠানের নাম আজীবন সমুজ্জ্বল থাকবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিশেষকরে মৌখিক পরীক্ষার সময় অংশগ্রহণকারী সকলের জন্য এক কাপ কফি প্রতিষ্ঠানের খরচের মাত্রাকে তেমন বাড়াবে না। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ভ্যালু অনেক বাড়িয়ে দেবে। যাঁরা বাদ পড়ে যাবে তাঁদের সাথে একটু সৌহার্দপূর্ণ আচরণ প্রতিষ্ঠানকে আজীবন মনে রাখতে সহায়তা করবে। এ কারণে তাঁরা বারবার চেষ্টা করবে নিজেকে আরও যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেতে।
নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রেখে কর্মী বাছাই করলেই একটি প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ শেষ হয় না। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর কি পেল সেটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কর্মীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে ব্র্যান্ডিং করতে হলে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির জন্য প্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি যেন কাজ করার সময় নিজেকে অসহায় মনে না করেন তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে হবে। কর্মীর কোনো বিপদে প্রতিষ্ঠান যদি তাঁর পাশে দাঁড়ায়, কর্মীর বিরুদ্ধে যদি কোনো অন্যায় সিদ্ধান্ত না নেয়, কাজের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেয় তাহলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীর আনুগত্য অনেক বেড়ে যায়।
একজন কর্মীর মধ্যে ভ্যালু সংযোজন করা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। কর্মী যখন অনুভব করেন প্রতিষ্ঠান তাঁর উন্নয়নের জন্য কাজ করছে, যোগ্য করে গড়ে নিচ্ছে তখন কর্মীর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। কর্মীর মধ্যে ভ্যালু সংযোজন চাকরির বাজারে তাঁর মূল্যকে বাড়িয়ে দেয়। কর্মীর জন্য এ ধরনের পদক্ষেপগুলো আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে প্রতিষ্ঠান অনেক বেশি খরচ করছে। আসলে তা নয়। বরং, প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি বিনিয়োগ। কারণ, এই কর্মীরাই প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ভ্যালু অনেক বাড়িয়ে দেবে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃক গৃহিত প্রতিটি পদক্ষেপ কর্মীরা মুখে মুখে প্রচার করে বেড়ায়। ফলে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মানুষ উচ্চধারণা পোষণ করে। প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি পায়। এটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অনেক বড় অর্জন।
(চলবে)
সাবেক হেড, এইচআর ডিভিশন, ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি