Global Header Bottom
ভোক্তা আচরণ সম্পর্কে কেন জানতে হবে?

ভোক্তা আচরণ সম্পর্কে কেন জানতে হবে?

পর্ব- ৪

ভোক্তা আচরণ সম্পর্কে কেন জানতে হবে?

ক্রেতাদের ক্রয়আচরণ নানা কারণে পরিবর্তন হয়। ক্রয়আচরণ পরিবর্তনের পেছনে বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। প্রযুক্তি এবং এআই এই দুটি বিষয় বিশ্বের সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ভোক্তা আচরণের নানা পর্যায়ে প্রযুক্তি সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রযুক্তির কারণে প্রতিনিয়ত কিছু পণ্যের মধ্যে পরিবর্তন আসছে। বিশেষকরে ইলেকট্রিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক্স পণ্যের মধ্যে প্রযুক্তির ছোঁয়া সুস্পষ্ট। এমনকি অন্যান্য পণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণে প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান মনে করে তারা প্রযুক্তিকে স্বাগত জানাবে না, প্রযুক্তিকে আঁকড়ে ধরবে না, তাহলে সাময়িকভাবে কোনো প্রযুক্তির ক্ষতি হতে পারে। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি যদি ওই প্রযুক্তি ব্যবহার না করে তাহলে ওই প্রযুক্তির চাহিদা কমে যাবে বা চাহিদা থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। কারণ এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

একটি প্রতিষ্ঠানকে বেআইনিভাবে যেমন দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আবার কোনো কিছু গ্রহণ বা বর্জনের জন্য অযৌক্তিকভাবে বাধ্য করা যায় না। পৃথিবীতে মিলিয়ন, বিলিয়ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমরা যদি শুধু আমাদের দেশের কথা বিবেচনা করি তাহলে এখানেও লক্ষ লক্ষ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই লক্ষ লক্ষ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যে প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিকে আঁকড়ে ধরবে ওই প্রতিষ্ঠান অন্যদের তুলনায় এগিয়ে যাবে। ব্যবসা জগতে কেউ লোকসান দিতে চায় না। কেউ পেছনে পড়ে থাকতেও চায় না। যখন কোনো প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকবে তখন ওই প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবেই অন্যদের তুলনায় পেছনে পড়ে থাকবে। এ কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান মুখিয়ে থাকে কখন প্রযুক্তির নতুন কিছু আসবে, আর সেটা ধারণ করে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে এগিয়ে যাবে।

মার্কেটিংয়ে এসটিপি বলে একটি কথা আছে। এসটিপি’র পূর্ণরূপ হলো মার্কেট সেগমেন্টেশন, টার্গেটিং এবং পজিশনিং। মার্কেটিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হলো মার্কেট সেগমেন্টেশন বা বাজারকে বিভক্ত করা। এটা বাজারবিভক্তিকরণ নামে পরিচিত। ভোক্তাবাজার বিভক্তিকরণের ক্ষেত্রে চারটি উপাদানকে প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলো হলো জিওগ্রাফিক, ডেমোগ্রাফিক, সাইকোগ্রাফিক্স, এবং বিহেভিয়্যরাল। একজন মার্কেটারকে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে হবে। আমরা যদি জিওগ্রাফিক সেগমেন্টেশনের কথা বিবেচনা করি তাহলে দেখতে পাবো পৃথিবীর সকল অঞ্চলের, সকল দেশের, সকল মানুষের চাহিদা একরকম নয়। শীত প্রধান দেশের মানুষের কাছে যে পণ্যের তীব্র চাহিদা রয়েছে ওই একই পণ্য উষ্ণ অঞ্চলের মানুষের কাছে চাহিদা তৈরি করতে পারছে না। কারণ ওই পণ্য উষ্ণ অঞ্চলের মানুষের প্রয়োজন নেই। ধনী দেশের মানুষের চাহিদা আর গরিব দেশের মানুষের চাহিদা একরকম নয়। আবার ডেমোগ্রাফিক সেগমেন্টেশনের কথা বিবেচনা করলে এখানে ক্রেতার বা ভোক্তা বয়স, শিক্ষা, পেশা, আয়, লিঙ্গ সহ আরও কতগুলো বিষয় মার্কেটারকে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। কারণ সকল বয়সের ক্রেতার চাহিদা একরকম নয়।

সকল আয়ের মানুষ একই পণ্য ভোগ বা ব্যবহার করেন না। নারী-পুরুষ বা ছেলেমেয়েদের পণ্যের মধ্যেও ভিন্নতা রয়েছে। পেশাগত কারণেও পণ্যের মধ্যে ভিন্নতা তৈরি হয়। এই বিষয়গুলো একজন মার্কেটারকে বুঝতে হবে। সকল ক্রেতার কেনাকাটার ধরন একরকম নয়। কেউ অল্প পরিমাণে কেনে। আবার কারও অভ্যাস বেশি পণ্য কেনার। কেউ কেনার সময় পণ্যের ব্র্যান্ডকে অধিক প্রাধান্য দেয়। আবার অনেকের কাছে ব্র্যান্ড কোনো বিষয় নয়। পণ্য থেকে প্রয়োজনীয় মৌলিক সুবিধাটুকু পেলেই তিনি সন্তুষ্ট। মনস্তাত্ত্বিক কারণে অনেকে অনেক ব্র্যান্ডের প্রতি দুর্বল হতে পারে। প্রতিটি বিষয় মার্কেটারকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝতে হবে। যদি মার্কেটার এই কাজগুলো করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তাঁর পণ্য ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ হবে। ব্যাপক প্রচার করে ক্রেতাদের কাছে পণ্যের তথ্য পৌঁছাতে পারলেও ওই পণ্য গ্রাহকসন্তুষ্টি বা ক্রেতাসন্তুষ্টি অর্জনে ব্যর্থ হবে। কারণ মার্কেটার ক্রেতাদের চাহিদার কারণগুলো নিয়ে কোনো চিন্তা করেননি।

বাজারকে ভাগ করার পর মার্কেটারকে মার্কেট তথা ক্রেতাদের টার্গেট করতে হয়। এই টার্গেট করা অর্থ হলো কোন শ্রেণির ক্রেতাদের কাছে মার্কেটার পণ্য বিক্রি করতে চায় তা ঠিক করতে হবে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মার্কেটারকে ওই সেগমেন্ট বা বাজার অংশকে টার্গেট করতে হবে যে অংশের ক্রেতাদের চাহিদা তাঁর পক্ষে পূরণ করা সম্ভব হবে। কারণ দিনশেষে ক্রেতারা তাঁদের সর্বোচ্চ সুবিধাটুকু আদায় করে নেওয়ার চেষ্টা করবে। ক্রেতারা পণ্যকে বিবেচনা করে একগুচ্ছ সন্তুষ্টির সমাহার হিসেবে। এ কারণে মার্কেটার যেকোনো ক্রেতাদের তাঁর পণ্যের ক্রেতা মনে করলে ভুল করবেন। তাঁকে আগেই চিন্তা করতে হবে কোন শ্রেণির ক্রেতাদের চাহিদা তাঁর পক্ষে পূরণ করা সম্ভব।

ক্রেতাদের টার্গেট করার পর মার্কেটারের দায়িত্ব হলো ক্রেতাদের মনে জায়গা করে নেওয়ার কৌশল নির্ধারণ করা। মার্কেটিংয়ের ভাষায় এটাকে বলে পজিশনিং। অর্থাৎ ক্রেতাদের মনে নিজের ব্র্যান্ডের নামটি গেঁথে দেওয়া। কাজটি সহজ নয়। কারণ, বাজারে অনেকগুলো ব্র্যান্ডের পণ্য রয়েছে। সেখানে একজন ক্রেতা অন্য দশটি ব্র্যান্ড বাদ দিয়ে কেন একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্য বেছে নেবে তার যৌক্তিক কারণ মার্কেটারের কাছে থাকতে হবে। অন্যথায় ক্রেতারা তাঁর পণ্য কিনবে না।

(চলবে)

ভাইস চ্যান্সেলর, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক চেয়ারম্যান মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer