চিংড়িকথণ
সতর্কতা: ইহা একটি রম্য রচনা
আজকের লেখাটা একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। গল্পটা আমার মায়ের কাছ থেকে শোনা। এক দেশে এক গুরু আর তাঁর শিষ্য বাস করত। বহুকাল গুরুর কাছে শিক্ষা নেওয়ার পর শিষ্য ঠিক করল, তাঁর যথেষ্ট শিক্ষা নেওয়া হয়েছে এবার গুরুর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পালা। সে গুরুকে তাঁর ইচ্ছাটা জানালে গুরুও হাসি মুখে তাঁকে বিদায় জানালেন। শিষ্য গুরুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এদেশ-ওদেশ ঘুরে এক আজব দেশে এসে উপস্থিত হলো। সেখানে সব কিছুর এক দর, তেলের যে দাম ঘিয়েরও সেই একই দাম। ভাত, ডাল, তরিতরকারি সব এক দাম। সে তো দেখে মহাখুশী। সে তেলের দামে ঘি খেতে পারবে, ছোট মাছের দামে বড় মাছ! শিষ্য সেদেশেই থেকে যেতে মনস্থির করল। এক সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করে সে সেদেশেই থেকে গেল।
কিছুদিনের মধ্যেই ভালো ভালো ঘি-তরকারি খেয়ে সে বেশ নাদুশ-নুদুশ হয়ে উঠলো। এদিকে তাঁর জ্ঞান-গরিমায় সারাদেশ মুগ্ধ। বহু শিষ্য জুটে গেল তাঁর। একদিন তাঁর ডেরায় এক শিষ্যের গলার মালা চুরি হয়ে গেল। বহু খোঁজাখুঁজি করার পরও ওই মালাটি আর খুঁজে পাওয়া গেল না। ওই শিষ্যটি তখন কাজীর কাছে বিচার দিল। কাজী বিচারের রায় দিলেন, যেহেতু মালাটি আমাদের সেই শিষ্যের আস্তানা থেকে হারিয়ে গেছে তাই তাঁকেই এর দায় নিতে হবে। বিচারের শাস্তি শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড! শিষ্যটি তখন এর প্রতিবাদ করল, সামান্য মালা হারিয়ে যাওয়ার শাস্তি কেন মৃত্যুদণ্ড হবে? কিন্তু এদেশে যে সবই এক! মানুষ হত্যার শাস্তিও মৃত্যুদণ্ড, আবার একটা আপেল চুরির শাস্তিও মৃত্যুদণ্ড! কিছুই করার নেই, এটাই নিয়ম। বিচারক নির্দেশ দিলেন পরের দিনই যেন আসামীকে শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
এদিকে অনেকদিন প্রিয় শিষ্যকে না দেখে গুরুর খুব মন খারাপ লাগছিল। তাই তিনি তাঁর শিষ্যের খোঁজে বের হয়ে পড়লেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি যখন সেই তেল-ঘি এক দরের দেশে উপস্থিত হলেন তখন দেখেন এক জায়গায় অনেক লোক জটলা করেছে, কেমন যেন একটা উৎসব উৎসব ভাব! গুরু ভীড় ঠেলে সামনে এগিয়ে দেখেন, তাঁরই প্রিয় সেই শিষ্যকে শূলে চড়ানোর প্রায় সকল প্রস্তুতি শেষ। এদিকে ভীড়ের মধ্যে গুরুকে দেখতে পেয়ে শিষ্য ভেউভেউ করে কেঁদে উঠলো। গুরুকে কাছে পেয়ে সে সব কথা খুলে বলল। গুরু সব শুনে চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, “শিষ্য, অনেক কিছুই তোমাকে শিক্ষা দিয়েছি, কিন্তু তুমি শিক্ষা শেষের আগেই তড়িঘড়ি করে চলে আসলে তাই একটা কথা তোমাকে বলা হয়নি, তা হলো, যে দেশে তেল আর ঘিয়ের দাম এক, সেদেশে থাকতে নেই! কিন্তু এখন আর সেকথা বলে কি লাভ!” এই বলে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে তিনি সেদেশ থেকে চলে গেলেন।
বলতে চাচ্ছিলাম ট্যালেন্ট ম্যনেজমেন্ট নিয়ে। ব্যাপারটা অনেকটা আমাদের এই গল্পের মতোই। যেখানে সবার মূল্য এক, সেখানে প্রকৃত মেধাবীরা থাকেন না। কেননা তাঁদের প্রয়োজন আর মানসিকতা অন্যদের চাইতে খানিকটা আলাদা। উচ্চ বেতন বা সুযোগ-সুবিধার কারণে যদি কেউ থেকেও যান তাহলে তাঁরাও সেই শিষ্যের মতোই সাময়িক আরাম-আনন্দের পর চোখের পানি ফেলেন! তাঁদের মাথা থেকে আর ভালো কিছু বের হয়না। আমি বিশেষ কিছু বুঝি না, তবে আমার গুরা ইচা মাছের মস্তিক যা বলে তা হলো, ট্যালেন্টকে আলাদাভাবেই স্বীকৃতি দিতে হয়।
সবার সাথে এককাতারে তাঁদের দাঁড় করালে তাঁরা বেশিদিন সেখানে থাকতে পারেন না। তাঁদের মাথা ভর্তি বুদ্ধি তো, তাই একটু আউলা টাইপ হয় আরকি! তাঁদের মনোযোগও বেশিদিন একদিকে স্থির থাকে না, তাঁরা নিত্য নতুন সৃষ্টি বা চ্যালেঞ্জের নেশায় থাকেন সারাক্ষণ। এদের অধিকাংশই মুক্তমনা, তাই বেশি নিয়মকানুনের বেড়াজালে তাঁদের আটকে রাখা কষ্টকর। তাঁদেরকে ধরে রাখতে হলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন কিছুটা শিথিল করতে হয় বইকি! তা না হলে তাঁদের সেরাটা আপনি কখনোই পাবেন না। যে আলাদা তাঁকে তো আলাদাভাবেই দেখতে হবে, তাই না?
আবার একটু চিন্তা করে দেখুন না, এরা ট্যালেন্টেড বলেই তো আপনি এদেরকে আপনার প্রতিষ্ঠানে নিয়ে এসেছেন। আনার পর যদি আপনার মতো করেই তাঁদের চালাতে চান তাহলে তাঁদের ট্যালেন্টের কি দরকার? খামাখা অতিরিক্ত টাকা খরচ! সব ট্যালেন্ট আপনার একারই থাকলে আপনার আসলে দরকার হুকুম তামিল করার মতো একদল পাইক-পেয়াদা। রোজ আপনি তাঁদের হুকুম করবেন আর তাঁরা একান্ত বাধ্যের মতো তা তামিল করবে। রোজই এক রুটিন। এখানে বাইরের ট্যালেন্টের কি প্রয়োজন? আপনার ট্যালেন্টের প্রতি যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিবে সেই ট্যালেন্ট নিয়ে এসে কেন খামাখা খাল কেটে কুমির আনবেন? ফুল নিতে হলে সাথে কাঁটাও যে আসবে!
যে কোনো প্রতিষ্ঠানে সাম্যতার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কিন্তু সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার সৎ সাহসতো আপনার থাকতেই হবে, তা নাহলে হয় সাদাই থাকবে না হয় কালো। দিন শেষে আপনার প্রতিষ্ঠানের কর্মকান্ডতো সবই জাগতিক, মানে টাকা কামানোর ধান্ধা, থুক্কু, নিজের নামকে চিরস্মরণীয় করে রাখার প্রয়াশ বা ভবিষ্যত প্রজন্মের ভবিষ্যত গড়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা (ভয়ানক দার্শনিক কথাবার্তা!)।
তবে যেতে যেতে একটা কথা বলে যাই, মেধাকে মেধার মতো করেই মূল্যায়ন করুন, কেননা আপনার কাছে তেল আর ঘির দাম এক হলেও ঘি কিন্তু তার দাম ঠিকই বোঝে। তেল খাবেন না ঘি খাবেন, সিদ্ধান্ত আপনার।