নারী কর্মক্ষেত্রে
তাঁরা কি সত্যিই হেরে যায়, নাকি আমরা তাঁদের হারিয়ে ফেলি?
স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা লক্ষ নারীর অদেখা বাস্তবতা, সংগ্রাম, সম্ভাবনা, সাফল্য এবং মাঝপথে হারিয়ে যাওয়া নেতৃত্বের অপ্রকাশিত গল্প
অফিসের অদৃশ্য নেটওয়ার্ক
কর্মক্ষেত্রে সফলতা সবসময় শুধুমাত্র দক্ষতা, পরিশ্রম কিংবা ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। সম্পর্ক, দৃশ্যমানতা, বিশ্বাস এবং অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরা সাধারণত ধরে নিই, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো মিটিং রুমেই নেওয়া হয়। বাস্তবে বিষয়টি সবসময় এতটা সরল নয়। অনেক ধারণা তৈরি হয় চায়ের টেবিলে। অনেক সম্পর্ক গড়ে ওঠে অফিস-পরবর্তী আড্ডায়। অনেক বিশ্বাস তৈরি হয় অনানুষ্ঠানিক আলোচনায়। আর অনেক সুযোগের ভিত্তি তৈরি হয় সেই সম্পর্কগুলোর ওপর, যেগুলো কোনো অর্গানোগ্রাম বা নীতিমালায় লেখা থাকে না। অনেক নারী ইচ্ছাকৃতভাবে এই নেটওয়ার্কের বাইরে থাকেন। আবার অনেকেই বাস্তবতার কারণে এর অংশ হতে পারেন না। আর কিছু ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম। অনেক সময় তাঁদের বাদ দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য থাকে না, তবুও তাঁরা আমন্ত্রণ পান না। ধরে নেওয়া হয়, হয়তো তিনি আসতে পারবেন না। পরিবার অনুমতি দেবে না। অফিস-পরবর্তী আড্ডায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন না। অথবা অন্যরা বিষয়টিকে কীভাবে দেখবে, সেটি নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় বিষয়টি আরও জটিল।
অনেক কর্মক্ষেত্রে পুরুষ সহকর্মীর সংখ্যাই বেশি। ফলে কাজের বাইরে কোনো নারী সহকর্মী যদি কয়েকজন পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে সময় কাটান, আড্ডা দেন বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় অংশ নেন, তখন অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় গসিপ, ভুল ব্যাখ্যা কিংবা সামাজিক মন্তব্যের জন্ম হয়। এসব পরিস্থিতি সবসময় প্রকাশ্যে দেখা যায় না। কিন্তু এগুলো মানসিক অস্বস্তি তৈরি করে। কখনো পরিবারে প্রশ্ন তোলে। কখনো কর্মক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ব্যাখ্যার প্রয়োজন তৈরি করে। আর কখনো কখনো এসব বিষয় পুরুষ সহকর্মীকেই অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে দেয়। ফলে অনেক সময় তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিবর্তে তাঁর হয়ে অন্যরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। আর ঠিক সেখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারিয়ে যায়। কারণ নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্নতা সবসময় প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে তৈরি হয় না। অনেক সময় তা তৈরি হয় অনুমান থেকে।
আবার অনেক সময় সামাজিক বাস্তবতার প্রতি অতিরিক্ত সতর্কতা থেকেও। ফলে অনেক সময় তাঁরা শুধু একটি আড্ডা মিস করেন না। মিস করেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কিছু সম্পর্ক। কিছু অদৃশ্য সমর্থন। কিছু স্পন্সরশিপ। এবং কখনো কখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও। এটি সবসময় প্রকাশ্য বৈষম্য নয়। কিন্তু এর প্রভাব বাস্তব। কারণ কর্মক্ষেত্রে মানুষ শুধু কাজের মাধ্যমেই পরিচিত হয় না। সম্পর্কের মাধ্যমেও পরিচিত হয়। আর যখন কেউ বারবার সেই অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের বাইরে থেকে যায়, তখন ধীরে ধীরে তাঁর দৃশ্যমানতা কমে যায়। প্রভাব কমে যায়। আর অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্বের পথে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে পড়ে। সুযোগের অভাবে নয়। সুযোগের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার অভাবে। আর ঠিক এখানেই প্রতিষ্ঠানের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়, কারণ অনেক সময় প্রতিভা সুযোগ হারায় না; সুযোগের সঙ্গে সংযোগ হারায়।
নারী দিবসের মঞ্চ থেকে বোর্ডরুম পর্যন্ত: ইনক্লুশন-এর প্রকৃত পরীক্ষা কোথায়?
বছরের পর বছর ডাইভার্সিটি এবং ইনক্লুশন নিয়ে অসংখ্য আলোচনা, নীতিমালা এবং উদ্যোগ দেখার পরও একটি প্রশ্ন আমাকে বারবার ভাবিয়েছে, আমরা কি সত্যিই নারীদের অন্তর্ভুক্ত করছি, নাকি শুধু তাঁদের উপস্থিতিকে উদযাপন করছি? আজ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই বেশ আয়োজন করে নারী দিবস পালন করে। শুভেচ্ছা, প্রত্যাশা এবং সহযোগিতার অঙ্গীকারে মুখর থাকে অনুষ্ঠানগুলো। নারী কর্মীদের সাফল্যের গল্প তুলে ধরা হয়। ডাইভার্সিটি এবং ইনক্লুশন এখন অনেক প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে ডাইভার্সিটি এবং ইনক্লুশন এক বিষয় নয়। ডাইভার্সিটি নিশ্চিত করে কে টেবিলে বসার সুযোগ পেল। ইনক্লুশন নির্ধারণ করে কার কথা শোনা হলো, কার মতামত গুরুত্ব পেল এবং কার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তুলে দেওয়া হলো। অনেক প্রতিষ্ঠান ডাইভার্সিটিকে উদযাপন করে।
কিন্তু ইনক্লুশন-এর প্রকৃত মূল্য দিতে হয় ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং আস্থা ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে। আর আমার অভিজ্ঞতায়, ইনক্লুশন-এর প্রকৃত চিত্র বোঝা যায় ঠিক সেই মুহূর্তগুলোতে, যখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, দায়িত্ব এবং নেতৃত্বের সুযোগ বণ্টন করা হয়। যখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। যখন প্রফিট অ্যান্ড লস ওনারশিপ দেওয়া হয়। যখন স্ট্র্যাটেজিক লিডারশিপ রুল নির্ধারণ করা হয়। যখন ক্রিটিক্যাল ডিসিশন মেকিং পজিশন-এর জন্য কাউকে বেছে নেওয়া হয়। ঠিক তখনই অনেক প্রতিষ্ঠানের অদৃশ্য দ্বিধাগুলো সামনে চলে আসে। কখনো প্রশ্ন ওঠে না একজন নারী যোগ্য কি না। প্রশ্ন ওঠে তিনি কি এই দায়িত্ব সামলাতে চাইবেন?
তিনি কি পর্যাপ্ত সময় দিতে পারবেন? তিনি কি এই ভূমিকায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন? আর কখনো কখনো তাঁকে প্রশ্ন করার আগেই তাঁর হয়ে উত্তরটিও ধরে নেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে এখনও এমন মানসিকতা দেখা যায়, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু ভূমিকা বা দায়িত্বকে অঘোষিতভাবে পুরুষ-প্রধান কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে সুযোগের দরজা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও সবার জন্য সমানভাবে খোলা থাকে না। আরও একটি কঠিন সত্য হলো ইনক্লুশন-এর প্রকৃত পরীক্ষা নিয়োগে নয়; নেতৃত্বের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার সময়। কারণ একজন নারীকে নিয়োগ দেওয়া সহজ। কিন্তু তাঁর ওপর ব্যবসার ভবিষ্যৎ নির্ভর করার মতো আস্থা তৈরি করা সেখানেই প্রকৃত মানসিকতার পরীক্ষা। আমার অভিজ্ঞতায়, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে কখনও বলবে না যে তাঁরা নারীদের নেতৃত্বে দেখতে চায় না। বরং প্রায় সবাই সমান সুযোগের কথা বলে। কিন্তু প্রকৃত চিত্রটি বোঝা যায় সিদ্ধান্তের মুহূর্তে। যখন নতুন ব্যবসা ইউনিটের দায়িত্ব দিতে হয়। যখন বড় বাজেটের দায়িত্ব দিতে হয়। যখন সংকটকালীন নেতৃত্ব বেছে নিতে হয়।
যখন উত্তরসূরি নির্ধারণ করতে হয়। তখন প্রশ্নটি আর নীতিমালার থাকে না। প্রশ্নটি হয়ে যায় আস্থার। আমরা কাদের ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা করি? কাদের হাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি? আর সেই উত্তরই অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ইনক্লুশন কালচার প্রকাশ করে। কারণ ডাইভার্সিটি মানে শুধু টেবিলে একটি আসন দেওয়া নয়। ইনক্লুশন মানে সেই আসনের মানুষটির মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। তাঁকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া। এবং প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব তাঁর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। নারী দিবসের মঞ্চে করতালি দেওয়া সহজ। কিন্তু বোর্ডরুমে আস্থা দেওয়া অনেক কঠিন। আর ঠিক সেখানেই ইনক্লুশন-এর প্রকৃত পরীক্ষা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: পোস্ট, প্রোফাইল ও বিচার ডিজিটাল যুগে নারীর নতুন চ্যালেঞ্জ
ডিজিটাল যুগ নারীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। আজ একজন নারী তাঁর চিন্তা, অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত অর্জন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরতে পারেন। নিজের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারেন। নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারেন। নতুন সুযোগের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারেন। কিন্তু এই নতুন সুযোগের সঙ্গে এসেছে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জও। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু দৃশ্যমানতা বাড়ায় না। এটি বিচারকেও দৃশ্যমান করে। একজন নারী কী লিখলেন। কী ছবি দিলেন। কী মত প্রকাশ করলেন। কোথায় গেলেন। কার সঙ্গে দেখা করলেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন কেমন। তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক কেমন। এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলোও অনেক সময় প্রকাশ্য আলোচনা ও সমালোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। অনেক সময় এসব বিষয় তাঁর দক্ষতা, অবদান কিংবা পেশাগত সক্ষমতার চেয়েও বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
ফলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে অনেক নারী নিজেদের প্রকাশ করার আগে বারবার ভাবতে বাধ্য হন “এটি মানুষ কীভাবে নেবে?” “এটি কি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?” “এটি কি অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা বা ব্যক্তিগত আক্রমণের কারণ হবে?” সাইবার বুলিং, অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা অনলাইন হয়রানি অনেক নারীর জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতা। ফলে অনেকেই ধীরে ধীরে নিজেদের দৃশ্যমানতা সীমিত করতে শুরু করেন। কম লিখেন। কম মত প্রকাশ করেন। কম অংশগ্রহণ করেন। অথচ বর্তমান কর্মজীবনের বাস্তবতায় দৃশ্যমানতা, নেটওয়ার্ক এবং ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সমস্যাটি শুধু অনলাইন হয়রানির নয়। সমস্যাটি হলো একজন মানুষের আত্মপ্রকাশের পরিধি সংকুচিত হয়ে যাওয়া। আর যখন প্রতিভাবান মানুষরা নিজেদের কণ্ঠস্বর সীমিত করতে শুরু করেন, তখন ক্ষতিটা শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত নয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কর্মক্ষেত্র, নেতৃত্বের বৈচিত্র্য এবং জনপরিসরের আলোচনাও। কারণ অনেক সময় “মানুষ নীরব হয়ে যায় মতের অভাবে নয়; বিচারিত হওয়ার ক্লান্তিতে”।
(চলবে)
অনুভব রহমান বাংলাদেশের করপোরেট ও ফিনটেক খাতের একজন সুপরিচিত এবং অভিজ্ঞ মানবসম্পদ (HR) পেশাদার। তিনি বর্তমানে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নগদ লিমিটেড-এর চিফ হিউম্যান রিসোর্সেস অফিসার (CHRO) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নগদ-এ যোগদানের পূর্বে তিনি ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (EBL)-এর অর্গানাইজেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ক্যাপাসিটি এনহ্যান্সমেন্ট সেন্টারের প্রধান (Head) হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, কর্মীবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরি এবং কৌশলগত নেতৃত্বের দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন।